
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিশ্বনাথ থেকে ::: সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ৫ নং দৌলতপুর ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর নেতা খোরশেদ আলমের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব গত কয়েক বছরে ক্রমেই বেড়েছে বলে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র ও এলাকাবাসীর বক্তব্যে উঠে এসেছে। একসময় ইউনিয়ন জামায়াতের (সহকারী সেক্রেটারি) এবং পরবর্তীতে সেক্রেটারি হিসেবে পরিচিত খুরশেদ আলম বর্তমানে ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি (আমীর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পারিবারিক ও রাজনৈতিক পটভূমি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকায় নারীদের উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক মতপার্থক্য দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে স্থানীয় এক প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দৌলতপুরে সামাজিকভাবে পরিচিত। ঐ পরিবারের প্রধান এশাদ আলী
অতীতে ৫ নং দৌলতপুর ইউনিয়নের, ওয়ার্ড যুবলীগের দুইবারের নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং তাঁর বাড়িতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি তিনি এলাকার সাধারণ মানুষকে যেকোনো ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাবলম্বী হওয়ার কাজে উৎসাহিত ও সার্বিক সহযোগিতা করতেন। উক্ত পরিবারের সন্তান ইউনিয়ন যুবলীগ নেত্রী হাবিবা বেগম স্থানীয় নারীদের সংগঠিত করা, সেলাই প্রশিক্ষণ, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় উৎসাহিত করার কাজে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে হাবিবা বেগম লন্ডনে অবস্থান করছেন।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, নারীবিদ্বেষী অবস্থান ও বিরোধ
ইসলাম ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং চরমপন্থা বাস্তবায়নের অভিযোগ রয়েছে জামায়াত নেতা খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে। দৌলতপুর ইউনিয়নে নারীদের স্বাবলম্বী করার নানা উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের ঘরের বাইরে আয়ের পথ সুগম করা। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, খোরশেদ আলম ও তাঁর অনুসারীরা ধর্মীয় গোঁড়ামির দোহাই দিয়ে নারীদের ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করা, প্রশিক্ষণ নেওয়া বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার বিরুদ্ধে চরম বেপরোয়া ও নারীবিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করতেন।
এমনকি নারীদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখতে তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর তীব্র মানসিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা হতো এবং স্থানীয়ভাবে নানারকম অপপ্রচার চালানো হতো। ধর্মকে ব্যবহার করে নারীদের অগ্রগতিকে বাধার মুখে ফেলার এই বেপরোয়া আচরণের কারণে খোরশেদ
আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবার ও নারী উদ্যোক্তাদের তীব্র সামাজিক বিরোধ তৈরি হয়।
৫ আগস্টের সহিংসতা, থানা হামলা ও ব্যবসা বন্ধ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিন ও তার পরবর্তী সময়ে দৌলতপুরসহ বিশ্বনাথের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। ৫ আগস্টের পর বিশ্বনাথ থানায় দুষ্কৃতকারীরা অতর্কিত হামলা চালায়, থানার ভিতরে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের গাড়ি ভাঙচুর এবং থানায় অগ্নিসংযোগ করে। এই হামলার ফলে বিশ্বনাথ থানা বেশ কিছুদিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে এবং আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে আওয়ামী, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রাণ ও জীবন বাঁচানোর তাগিদে আত্মগোপনে চলে যান। এলাকা খালি পেয়ে রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতাবলম্বী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়িতে বিপুলসংখ্যক ভাঙচুর চালানো হয়। এমনকি নেতাকর্মীদের না পেয়ে এলাকায় অবস্থানরত তাঁদের পরিবারের সদস্য ও সাধারণ সদস্য সমর্থকদের ওপরও হামলা ও মারধর করা হয়।
এই চরম আতঙ্ক ও সহিংসতার ধাক্কা সরাসরি গিয়ে পড়ে নারী উদ্যোক্তা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপর। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের সহিংস পরিস্থিতির পর নারী সংগঠনের মাধ্যমে যে সকল নারীরা ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তাঁদের সকলের ব্যবসা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং খোরশেদ আলম ও তার ক্যাডার বাহিনীর বেপরোয়া তাণ্ডবের পাশাপাশি বিএনপি ও তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী প্রকাশ্যে হামলার ঘটনার মুখে তাঁরা সবাই ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। খোরশেদ আলমের বেপরোয়া মনোভাব ও বর্তমান প্রভাব থানা আক্রান্ত হওয়া ও পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ফলে জামায়াত ও এর অনুসারীদের তৎপরতা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এলাকা জুড়ে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে খোরশেদ
আলমের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটি পুরো দৌলতপুরে একক প্রভাব বিস্তার শুরু করে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালে দৌলতপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি (আমীর) হওয়ার পর
খোরশেদ আলমের অবস্থান আরও সুসংহত ও শক্তিশালী হয়।
বর্তমানে তাঁর প্রভাব কেবল দলীয় রাজনীতির মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই; স্থানীয় সামাজিক বিচার-সালিশ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি ও তাঁর অনুসারীরা চরম বেপরোয়া ভূমিকা পালন করছেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও চরমপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করে ভবিষ্যতে নারীদের মুক্ত চলাফেরা ও সামাজিক স্বাধীনতাকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসীর একটি বড় অংশ।
সার্বিক বিশ্লেষণ
স্থানীয় বিভিন্ন বক্তব্য ও তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতীতে ইউনিয়ন জামায়াতের
(সহকারী সেক্রেটারি) ও সেক্রেটারি থেকে শুরু করে ২০২৬ সালে সভাপতি (আমীর) হওয়ার মধ্য দিয়ে খোরশেদ আলমের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের এক বেপরোয়া ধারাবাহিক পরিবর্তন ঘটেছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও নারীবিদ্বেষী অবস্থানের ফলে অতীতে গড়ে ওঠা নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগগুলো ৫ আগস্টের সহিংস পটপরিবর্তনের সুযোগে পুরোপুরি বন্ধ ও ধ্বংস হয়ে গেছে।
সম্পাদক : চৌধুরী মিনহাজুল ইসলাম
নিউজ ইনচার্জ : আশরাফ খন্দকার মাছুম
অফিস : বন্দর বাজার, এশিয়া সুপার মার্কেট -৩১০০
ইমেইল : sylhetnewsdaily@gmail.com
Copyright © 2026 সিলেটের খবর প্রতিদিন. All rights reserved.